আইইএর পূর্বাভাস

অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও জ্বালানি খাতে রেকর্ড বিনিয়োগ

ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বিশ্বব্যাপী নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, যার কারণে হুমকির মুখে রয়েছে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি।

ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বিশ্বব্যাপী নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, যার কারণে হুমকির মুখে রয়েছে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি। এমন অনিশ্চিত ব্যবসায়িক পরিস্থিতির মাঝেও চলতি বছর বৈশ্বিক জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ রেকর্ড ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন বা ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছতে পারে। একই পূর্বাভাসে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ) জানিয়েছে, জ্বালানি খাতের সাম্প্রতিক বিনিয়োগে প্রাধান্য পাচ্ছে কম কার্বন নিঃসরণ করে এমন ব্যবস্থাপনা। খবর দ্য ন্যাশনাল।

প্যারিসভিত্তিক সংস্থাটি গত সপ্তাহে প্রকাশ করেছে ‘ওয়ার্ল্ড এনার্জি ইনভেস্টমেন্ট ২০২৫’ প্রতিবেদন। সেখান থেকে জানা যাচ্ছে, জ্বালানি খাতে মোট বৈশ্বিক বিনিয়োগের ২ লাখ ২০ হাজার কোটি ডলার যাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পারমাণবিক শক্তি, বিদ্যুৎ গ্রিড, স্টোরেজ, কম কার্বন নিঃসরণ করে এমন জ্বালানি, জ্বালানি দক্ষতা ও বিদ্যুতায়নের পেছনে। বাকি ১ লাখ ১০ হাজার কোটি ডলার খরচ হবে জীবাশ্মভিত্তিক জ্বালানি তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লা খাতে। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালে মোট বিনিয়োগ গত বছরের তুলনায় প্রায় ২ শতাংশ বাড়তে পারে।

আইইএ বলছে, অর্থনীতি ও বাণিজ্য ঘিরে অনিশ্চয়তা থাকায় কিছু বিনিয়োগকারী নতুন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে সময় নিচ্ছে। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায় সেদিকে নজর রাখছে তারা। তবে এখন পর্যন্ত চলমান প্রকল্পে ব্যয়ের ওপর ধীরে চলার এ নীতির বড় কোনো প্রভাব পড়েনি।

জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পেছনে অন্যতম কারণ বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-চালিত ডাটা সেন্টারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা। আইইএ জানিয়েছে, ২০২৫ সালে বিদ্যুৎ খাতে ডাটা সেন্টারের চাহিদাকেন্দ্রিক বিনিয়োগ ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর ব্যবস্থাপনার বদলে কম কার্বন নিঃসরণ বা শূন্য নিঃসরণ জ্বালানিতে রূপান্তরে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশ মনোযোগ বাড়িয়েছে। আইইএর মতে, গত পাঁচ বছরে এ ধরনের রূপান্তরে ব্যয় দ্রুত বেড়েছে। কভিড-পরবর্তী পুনরুদ্ধার প্যাকেজে অনেক দেশ পরিবেশবান্ধব জ্বালানি অন্তর্ভুক্ত করায় এ প্রবণতার শুরু এবং এরপর অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত, শিল্প ও জ্বালানি নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিবেচনায় তা বজায় থাকে। অর্থাৎ জ্বালানি রূপান্তর প্রক্রিয়ায় শুধু জলবায়ু নীতি প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে এমন নয়।

এ বাড়তি তৎপরতার অংশ হিসেবে কম কার্বন নিঃসরণ করে এমন জ্বালানি উৎপাদনে বিনিয়োগ দ্বিগুণ হবে। বিশেষ করে ২০২৫ সালে সৌরবিদ্যুৎ খাতে ব্যয় ৪৫ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছবে, যা আইইএর বৈশ্বিক বিনিয়োগ তালিকায় সবচেয়ে বড় একক খাত।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির রমরমা এ অবস্থায় সোলার প্যানেলের বাজার বেশ প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেক সময় ব্যাটারিসহ প্যানেল খুব কম দামেই পাওয়া যাচ্ছে, যা কিনা অনেক উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশে জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ার প্রধান কারণ।

অন্যদিকে চলতি বছর জ্বালানি তেল উত্তোলনভিত্তিক আপস্ট্রিম খাতে বিনিয়োগ ৫৭ হাজার কোটি ডলারের নিচে থাকবে, যা কিনা এ খাতে ২০২৪ সালের বিনিয়োগের চেয়ে ৬ শতাংশ কম। একই সঙ্গে এটি ২০২০ সালের কভিডজনিত ধসের পর প্রথমবারের মতো খাতটিতে বিনিয়োগে বার্ষিক পতন এবং ২০১৬ সালের পর সবচেয়ে বড় সংকোচন।

আইইএ বলছে, জ্বালানি তেলের কম মূল্য ও চাহিদা প্রত্যাশা কমে যাওয়ায় খাতটিতে বিনিয়োগ কমছে। সৌদি আরব ও রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন ওপেক প্লাস সম্প্রতি জানিয়েছে, বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে দেশগুলো তৃতীয় মাসের মতো জুলাইয়ে উত্তোলন বাড়াবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের জন্য আইইএর প্রাথমিক ধারণা ছিল, আপস্ট্রিম জ্বালানি তেল ও গ্যাস খাতে ব্যয় অপরিবর্তিত থাকবে। কিন্তু এখন জ্বালানি তেলের দাম চাপে পড়ায় বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহী হয়ে উঠছেন।

রেকর্ড পরিমাণ বিনিয়োগ প্রত্যাশিত হলেও জ্বালানি খাতে নতুন প্রকল্প অনুমোদনের বিষয়টি এখনো ‘অপেক্ষা ও দেখো’ নীতি অনুসরণ করছে। তবে আইইএর নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল বলেন, ‘চলমান প্রকল্পগুলোর ব্যয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব ফেলছে, এমনটা আমরা এখনো দেখতে পাইনি।’

সংস্থাটি আরো জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি দেশটির জ্বালানি তেল ও গ্যাস খাতে প্রভাব ফেলবে। কারণ আমদানীকৃত ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামে বাড়তি শুল্ক উৎপাদন ব্যয় বাড়াতে পারে।

অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি খাতে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা মোকাবেলায় দেশগুলোকে কৌশল পুনর্গঠন করা প্রয়োজন। এতে তারা জ্বালানি স্বনির্ভরতা অর্জনের দিকে যেতে হবে। আইইএ বলছে, বর্তমানে জ্বালানি নীতিনির্ধারকরা নতুন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মুখোমুখি এবং জ্বালানি সংকটের ঝুঁকি এখনো উঁচু স্তরে রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, অঞ্চলভিত্তিক হিসেবে জ্বালানি খাতে বিনিয়োগে পরিবর্তন এসেছে, যা এ খাতে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলবে। চীন এখনো বিশ্বের সবচেয়ে বড় জ্বালানি বিনিয়োগকারী। ১০ বছর আগে যেখানে বৈশ্বিক পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে চীনের হিস্যা ছিল এক-চতুর্থাংশ, বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হয়েছে। অন্যদিকে গত দশকে যুক্তরাষ্ট্রে নবায়নযোগ্য ও কম নিঃসরণকারী জ্বালানিতে ব্যয় দ্বিগুণ হলেও এখন তা স্থির হতে শুরু করেছে। কারণ জীবাশ্ম জ্বালানি খাতকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি সহায়ক নীতি থেকে কিছুটা সরে আসছে ওয়াশিংটন।

অন্যদিকে এরই মধ্যে জ্বালানি তেল ও গ্যাস খাতে ব্যাপক ব্যয় করছে মধ্যপ্রাচ্য। চলতি বছরে বৈশ্বিক আপস্ট্রিম বিনিয়োগে অঞ্চলটির হিস্যা রেকর্ড ২০ শতাংশে পৌঁছবে। এ ব্যয়ের বড় একটি অংশ যাবে প্রাকৃতিক গ্যাস প্রকল্প সম্প্রসারণে।

আরও